মে ৩১, ২০১৭,১০:১২ অপরাহ্ণ
টেকনাফ প্রতিনিধি : ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র আঘাতে বিধ্বস্ত হয়ে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় ৪০ হাজারের বেশি মানুষ ঘরহারা হয়েছে। অনেকে ভাঙা ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
মঙ্গলবার ভোরে ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র উপকূল অতিক্রম করার সময় বিধ্বস্ত করে দেয় টেকনাফকে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সৌন্দর্যের লীলাভূমি প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন ও সর্বদক্ষিণে ভূখণ্ডে অবস্থিত শাহপরীর দ্বীপে। সব মিলিয়ে টেকনাফে আট হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। এছাড়া অধিকাংশ ঘরবাড়ির টিন ও চাউনি উপড়ে পড়েছে।
টেকনাফ উপজেলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন সিদ্দিক বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোরার আঘাতে টেকনাফ উপজেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে প্রাথমিকভাবে সাড়ে চার হাজার ঘর-বাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
এই কর্মকর্তা বলেন, ইতিমধ্যে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের নিজ নিজ এলাকার ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
উপজেলা ইউপি চেয়ারম্যাদের মতে, ছয়টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার নিয়ে টেকনাফ উপজেলা গঠিত। গোটা উপজেলায় প্রায় ৪৮ হাজারের মতো ঘরবাড়ি রয়েছে। গত মঙ্গলবার ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র টেকনাফে ব্যাপক আঘাত হানে। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সেন্টমার্টিনে এক হাজার, সাবরাং-এ আটশ, টেকনাফ সদরে এক হাজার, হ্নীলায় ৭০০, হোয়াইক্যং-এক হাজার ও বাহাছড়া এক হাজারের মতো ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়ে ঘরহারা হয়েছে মানুষ। এছাড়া তাদের মতে আরও পাঁচ হাজারের বেশি ঘরের টিন ও চাউনি উপড়ে পড়ে ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া টেকনাফ পৌরসভায় প্রায় ৫০০ ঘরবাড়ি ভেঙে বিধ্বস্ত হয়েছে। যারা ঘরহারা হয়েছে তারা এখন আশ্রয়কেন্দ্র ও আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানান চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা।
তাদের অভিযোগ, উপজেলা প্রশাসন ইউপি চেয়ারম্যানদের সঙ্গে কথা না বলে মনগড়া একটি ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা প্রকাশ করেছে। এতে টেকনাফের মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করছে বলে জানান তারা।
এ ব্যাপারে টেকনাফ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহাজান মিয়া ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমার নির্বাচনীয় এলাকায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মোরার আঘাতে সদরের এক হাজারের বেশি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়ে ঘরহারা হয়েছে। এতে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র ও আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। এছাড়া আরও দুই হাজার ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে তারা কোনোমতে ত্রিপল দিয়ে মানবেতার জীবন কাটাচ্ছে।’
টেকনাফ সদরের ক্ষতিগ্রস্ত নুর হাকিম ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে আমার ঘর বিধ্বিস্ হয়ে গেছে, এখন আমি কই যাব, কোথায় থাকব? প্রথম দিন আমি পরিবার নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে মানবেতর রাত কাটিয়েছি। এখন এক আত্মীয় বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। সেখানেও থাকতে অনেক সমস্যা হয়।’ তিনি ঘরহারা মানুষদের দ্রুত ঘর নির্মাণ করে দেয়ার দাবি জানান সরকারের প্রতি।
টেকনাফ পৌরসভার ক্ষতিগ্রস্ত নুর আয়েশা বেগম বলেন, আমার সন্তান থাকার পরও না থাকার মতো। একটি ছোট চাউনির ঘরে বসবাস করতাম কিন্তু তুফান এসে আমার ঘরটা তছনছ করে দিছে। এখন আমি কোথায় থাকব নিজেও জানি না।
টেকনাফ সাবরাং ইউপি চেয়ারম্যান নুর হোসেন জানান, সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপে ঘূর্ণিঝড় মোরা সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে। এতে প্রায় হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। তারা এখন ঘর হারিয়ে সরকারি আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন এবং তাদের সহযোগিতা করা হচ্ছে। তাদের আর্থিকভাবে সহযোগিতা করার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।
শাহপরী দ্বীপের বাসিন্দা জসিম মাহমুদ জানান, বেড়ি বাঁধ ভাঙার কারণে গত পাচঁ বছর ধরে টেকনাফ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এ দ্বীপ। নেই কোনো সড়ক যোগাযোগ। ফলে দ্বীপের ৪০ হাজার জনগোষ্ঠীকে জোয়ার-ভাটার উপর নির্ভর করে চলাচল করতো হতো।
তিনি আরও জানান, গত মঙ্গলবার ঘূর্ণিঝড় মোরার আঘাতে আরও শাহপরীর দ্বীপের মানুষকে কষ্ট বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ ঘর হারিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। তার অভিযোগ, ক্ষতিগ্রস্তদের খোঁজ নিচ্ছে না স্থানীয় প্রশাসন। এখানে খাবারের সংকট রয়েছে তীব্র।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র আঘাতে টেকনাফ উপজেলায় জালিয়াপাড়া, চৌধুরীপাড়া, দক্ষিণ জালিয়াপাড়া, পুরান, মুণ্ডাল ডেইল, পুরানপাড়া, ডেইল্লর বিল, মহেষখালিয়াপাড়াসহ সব গ্রামই লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূর আহমেদ ঢাকাটাইমসকে জানান, ঘূর্ণিঝড় মোরা আঘাতে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। এ দ্বীপে প্রায় হাজারের মতো ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। এ দ্বীপে মানুষদের খাবার ও পানি সংকেট রয়েছে। পাঁচ হাজার মানুষ ঘর হারিয়ে আশ্রয়কেন্দ্র, হোটেল ও আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। এছাড়া দ্বীপের প্রায় ২০টি নৌকা ও ট্রলার বিধ্বস্ত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বুধবার সকালে নৌবাহিনীর একটি জাহাজ ত্রাণ নিয়ে সেন্টমার্টিনে পৌঁছেছে। প্রায় ৫০০ পরিবারকে ত্রাণ বিতরণ করা হবে বলে জানান তিনি।
ক্ষতিগ্রস্ত সহস্রাধিক নারীকে সাংসদ বদির অনুদান
ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র আঘাতে বিধ্বস্ত হয়ে ঘরহারা ১১০০ নারীকে আর্থিক অনুদান দিলেন উখিয়া-টেকনাফের সাংসদ আবদুর রহমান বদি। বুধবার দুপুরে টেকনাফ পৌরসভার পুরান পল্লান পাড়ার ক্ষতিগ্রস্ত প্রতি নারীকে এক হাজার টাকা করে অনুদান দেন তিনি।
এসময় সাংসদ আবদুর রহমান বদি বলেন, মঙ্গলবার ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র আঘাতে টেকনাফে ব্যাপক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়ে অনেক মানুষ ঘরহারা হয়েছে। এর মধ্যে বুধবার দুপুরে নিজস্ব তহবিল থেকে টেকনাফ পৌরসভার পুরান পল্লান পাড়ার ক্ষতিগ্রস্ত ১১০০ নারীকে জনপ্রতি এক হাজার টাকা করে মোট ১১ লাখ টাকা অনুদান দেয়া হয়েছে। এছাড়া সাবরাং ইউনিয়ন এলাকার ৫০০ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান দেয়া হয়।
সাংসদ বলেন, পাশাপশি টেকনাফ উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলো পরির্দশন করা হয়েছে। বিশেষ করে সেন্টমার্টিনের খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে নৌবাহিনীর সদস্যরা সেন্টমার্টিনের ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ শুরু করেছেন। এর আগের ঘূর্ণিঝড়কে হার মানিয়েছে এই ‘মোরা’।
পরিদর্শনকালে টেকনাফ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাফর আহমদ, সাবরাং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুর হোসেন ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন সিদ্দিক বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোরার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আসা বরাদ্দকৃত চাল নিজ নিজ ইউনিয়ন পরিষদে পাঠানো হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে সরকারি এ ত্রাণ পৌঁছে যাবে। এ উপজেলার জন্য সাড়ে ১৩ মেট্রিন চাল বরাদ্দ আসে বলে জানান তিনি।
Md. Riadul Islam (Afzal) Site Developed By: Md. Shohag Hossain