নভেম্বর ৭, ২০১৬,৯:০২ অপরাহ্ণ
বিডি নিউজ টিভি ২৪ ডট কম: মোঃ সোহাগ হোসেন: গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে রংপুর চিনিকলের খামারের আখ কাটা নিয়ে পুলিশ ও চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে এক সাঁওতাল যুবক নিহত হয়েছেন।
গোবিন্দগঞ্জ থানা পুলিশ মৃত্যুর ব্যাপারে কোনো তথ্য না দিলেও দিনাজপুর কোতোয়ালি থানা ও দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
নিহত শ্যামল হেমভ্রম (৩৫) চাপাইনবাবগঞ্জের গোমেস্বরপুরের বাসিন্দা। দীর্ঘদিন থেকে তিনি সাহেবগঞ্জ এলাকায় বসবাস করে আসছিলেন।
রংপুর চিনিকলের সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারে রোববার সকালে এ সংঘর্ষ হয়। আহত শ্যামলকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
দিনাজপুর কোতোয়ালি থানার ওসি রেদোয়ানুর রহিম জানান, ময়নাতদন্ত শেষে শ্যামল হেমভ্রমের মরদেহ মর্গে রাখা হয়েছে। সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কেউ লাশ নিতে আসেনি।
আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্র সরেন পুলিশের গুলিতে শ্যামলের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করলেও কীভাবে মৃত্যু হয়েছে তা পুলিশ জানায়নি।
তবে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডা. আশরাফুল হক বলেন, “কোমরে গুলিবিদ্ধ হয়েছে শ্যামলের মৃত্যু হয়েছে।”
এদিকে ওই ঘটনায় রোববার রাতে গোবিন্দগঞ্জ থানার এসআই কল্যাণ চক্রবর্তী বাদী হয়ে
একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় ৩৮ জনের নাম উল্লেখসহ ৩৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
এর আগে রোববার সন্ধ্যায় পুলিশ ও র্যাব যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে বিরোধীয় ওই জমি থেকে সাঁওতালসহ অন্য দখলদারদের উচ্ছেদ করেছে। এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। পরবর্তী পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
এদিকে মামলার পর গ্রেপ্তারের ভয়ে আদিবাসীরা বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে গেছে।
সোমবার সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ওই এলাকায় বাড়ি-ঘরের কোনো চিহ্ন নেই। তবে কোথাও কোথাও অস্থায়ী টিনের ঘরের চিহ্নসহ পোড়া ছাই দেখা গেছে।
সাঁওতালদের অভিযোগ, উচ্ছেদ অভিযানের পর স্থানীয় লোকজন তাদের অস্থায়ী ঘরগুলোর টিন, বাঁশ এমনকি গরু-ছাগল লুটপাট করে নিয়ে গেছে।
রংপুর চিনিকলের সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের এক হাজার ৮৪২ একর জমির মালিকানা নিয়ে স্থানীয় আদিবাসীদের সঙ্গে চিনিকল কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল।
রোববার সকালে ইক্ষু খামারের শ্রমিক-কর্মচারীরা পুলিশ পাহারায় বাগদা-কাটা সংলগ্ন এলাকায় আখ কাটতে গেলে সেখানে থাকা সাঁওতালসহ কতিপয় দখলদার তাদের বাধা দেয়। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া ও সংর্ঘষ বাধে।
পুলিশের দাবি, সাঁওতালদের ছোড়া তীরে নয় পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
সাঁওতালদের দাবি, পুলিশের গুলিতে চারজন সাঁওতাল গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, যাদের মধ্যে নিহত শ্যামলও রয়েছেন।
আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্র সরেন ও সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ইক্ষু খামার জমি উদ্ধার সংহতি কমিটির সহ-সভাপতি ফিলিমন বাস্কে বলেন, পুলিশের ছোড়া গুলিতে তাদের চারজন গুলিবিদ্ধ হয়।
এরা হলেন দিনাজপুরের দ্বিজেন টুটু, বদরগগঞ্জের চরণ সরেন, দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের বিমল কিশকু এবং চাপাইনবাবগঞ্জের শ্যামল হেমভ্রন।
দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে শ্যামল মারা যান বলে তারা জানান।
গুলিবিদ্ধ বাকিরা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে চিকিৎসাধীন বলে জানান তারা।
শ্যামল হেমভ্রমের মারা যাওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে গোবিন্দগঞ্জ থানার ওসি সুব্রত কুমার বলেন, এ ব্যাপারে তার কাছে কোনো তথ্য আসেনি।
ওসি বলেন, ওই সঙঘর্ষের ঘটনায় রোববার রাতে এসআই কল্যাণ চক্রবর্তী বাদী হয়ে ৩৮ জনের নাম উল্লেখসহ সাড়ে ৩শ’ জনের বিরুদ্ধে গোবিন্দগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন।
চিনিকলের ‘সরকারি জমির’ দখলদারদের অধিকাংশই সাঁওতাল উল্লেখ করে মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে বলে তিনি জানান।
সোমবার দুপুরে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক আব্দুস সামাদ সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার পরিদর্শন করেছেন।
রংপুর চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল আউয়াল বলেন, রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ ১৯৬২ সালে আখ চাষের জন্য গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ এলাকায় এক হাজার ৮৪২ একর জমি অধিগ্রহণ করে। তখন থেকে এসব জমিতে উৎপাদিত আখ চিনিকলে সরবরাহ করা হচ্ছিল। কিন্তু দুই বছর আগে এসব জমি পূর্বপুরুষদের দাবি করে আন্দোলনে নামে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের লোকজন।
“আন্দোলনের এক পর্যায়ে তারা গত ১ জুলাই এই খামারের প্রায় ১০০ একর আবাদী জমিতে ছোট ছোট কুঁড়ে ঘর নির্মাণ করে দখলের চেষ্টা চালায়। ইতিমধ্যে তারা সেখানে ধান ও মাসকালাই চাষ শুরু করে।
“ওইদিন থেকে তারা তীর-ধনুক নিয়ে জমি পাহাড়া দিচ্ছে। রোববার চিনিকলের রোপন করা আখ বীজ হিসেবে সংগ্রহের জন্য কাটতে গেলে সাঁওতালরা বাধা দিলে এই ঘটনা ঘটে।”
আউয়াল আরও বলেন, ১৯৬২ সালে জমি অধিগ্রহণের সময় চুক্তিনামায় বলা হয়, কখনও চিনিকল বা খামার বন্ধ হলে সেক্ষেত্রে ওই জমি সরকারের কাছে চলে যাবে। অথচ এলাকার কতিপয় ‘সুবিধাবাদী’ ব্যক্তির উস্কানিতে সাঁওতালরা অবৈধভাবে চিনিকলের জমি দখল করে।
এ ব্যাপারে ইক্ষু খামার জমি উদ্ধার সংহতি কমিটির সহ-সভাপতি ফিলিমন বাস্কে বলেন, কারও উস্কানিতে আন্দোলন করা হচ্ছে না। চিনিকল কর্তৃপক্ষ জমি অধিগ্রহণের সময় জমির মালিকদের সঙ্গে চুক্তি করে। সেখানে উল্লেখ ছিল- ‘কখনও ওইসব জমিতে আখ ছাড়া অন্য ফসলের চাষ হলে প্রকৃত মালিকদের জমি ফেরত দেওয়া হবে।’
“কিন্তু কিছুদিন ধরে ওইসব জমিতে ধান ও তামাক চাষ হচ্ছে। অথচ জমি ফেরত দেওয়া হয়নি। তাই দখলের ঘটনা ঘটে।”
Md. Riadul Islam (Afzal) Site Developed By: Md. Shohag Hossain