নিরাপত্তা পরিষদে বাকি ১৪ দেশের প্রতিনিধিদের পাশে নিয়ে এই সংবাদ সম্মেলনে চুরকিন বলেন, গুতেরেসের মনোনয়ন সবার সমর্থন পাবে বলেই তিনি আশা করছেন।
“আমরা আশা করছি, মিস্টার গুতেরেস নিজের দায়িত্ব ছেড়ে আগামী পাঁচ বছরের জন্য জাতিসংঘ মহাসচিবের দায়িত্ব নেবেন।”
বিবিসির খবরে বলা হয়, ৬৭ বছর বয়সী গুতেরেসের মনোয়ন চূড়ান্ত করতে বৃহস্পতিবার নিরাপত্তা পরিষদে আনুষ্ঠানিক ভোটাভুটি হবে। এরপর নিরাপত্তা পরিষদ তাদের মনোনীত প্রার্থীর নাম তুলবে ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদে; সেখানেই আসবে চূড়ান্ত অনুমোদন।
আসছে ৩১ ডিসেম্বর বর্তমান মহাসচিব বান কি-মুনের মেয়াদ পূর্ণ হলে নতুন বছরে জাতিসংঘের হাল ধরবেন নতুন মহাসচিব।
পর্তুগাল থেকে জাতিসংঘে
পেশায় প্রকৌশলী গুতেরেস রাজনীতিতে আসেন ১৯৭৬ সালে। পাঁচ দশকের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটানো ‘কার্নেশন বিপ্লবের’ পর ওই বছরই দেশটিতে প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৯২ সালে তিনি দেশটির সোশালিস্ট পার্টির নেতা নির্বাচিত হন; তিন বছর পর হন প্রধানমন্ত্রী।
২০০৫ সালে গুতেরেস জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক কমিশনের দায়িত্ব নেন। এরপর এক দশক তিনি ব্যস্ত ছিলেন সিরিয়া, আফগানিস্তান ও ইরাকের মত দেশগুলোর শরণার্থী সঙ্কট মোকাবেলায়। যুদ্ধবিধ্বস্ত শরণার্থীদের আরও বেশি সহায়তা দিতে পশ্চিমা সমাজকে বার বার অনুরোধ করেছেন তিনি।
পর্তুগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট অ্যানিবাল কাভাবো সিলভা এ বছরের শুরুতে বলেছিলেন, গুতেরেস শরণার্থী বিষয়ক কমিশনে ‘কিংবদন্তিতুল্য’ কাজ করেছেন।
জাতিসংঘের অলিখিত রীতি অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চল থেকে পালাক্রমে মহাসচিব বেছে নেওয়া হয়। সে হিসেবে এবার নতুন মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার কথা পূর্ব ইউরোপ থেকে। আর জাতিসংঘের নেতৃত্বে প্রথমবারের মত একজন নারীকে পাওয়ার আগ্রহও দেখিয়েছিল প্রভাবশালী কয়েকটি দেশ।
এবার নারী মহাসচিব পাওয়ার সম্ভাবনা মিইয়ে আসায় হতাশা থাকলেও এ নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ‘বিতর্কের উর্ধ্বে’ রাখা উচিত বলে মনে করছেন জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি সামান্থা পাওয়ার।
তিনি বলেন, “শেষ পর্যন্ত একজনকে বেছে নেওয়া হয়েছে, যার অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও বিশাল এলাকাজুড়ে কাজ করার সক্ষমতা প্রমাণিত।”
এবারের মহাসচিব নির্বাচন প্রক্রিয়া আগের চেয়ে ‘অনেক বেশি স্বচ্ছ’ হয়েছে বলেও মনে করেন এ কূটনীতিক।
যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধি ম্যাথিউ রাইক্রফট বলেন, “যখন সারা দুনিয়া অনেক বিষয়ে দ্বিধাবিভক্ত, সেই সময় দায়িত্ব নিয়ে গুতেরেস জাতিসংঘকে নেতৃত্বের পরবর্তী ধাপে নিয়ে যাবেন বলে আশা রাখছি।”
>> জাতিসংঘের শীর্ষ পদে কখনোই কোনো নারীকে দেখা যায়নি। এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা সাতজনই ছিলেন নারী।
>> নারী প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় হিসেবে উচ্চারিত হচ্ছিল বুলগেরিয়ার ইরিনা বোকোভা’র নাম। ৬৩ বছর বয়সী ইউনেস্কোর এ মহাপরিচালক নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের ভোটে চতুর্থ হয়েছেন।
>> প্রার্থীদের মধ্যে আরও ছিলেন নিউজিল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হেলেন ক্লার্ক। ৬৬ বছর বয়সী এ নারী বর্তমানে জাতিসংঘের উন্নয়ন সংস্থার প্রধান।
>> ছিলেন মলদোভার সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী ও ইউরোপিয়ান ইন্টিগ্রেশন মন্ত্রী নাতালিয়া ঘেরমেন (৪৭), ক্রোয়েশিয়ার সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী ভেসনা পুসিক (৬২) এবং ইউরোপিয়ান কমিশনের বাজেট ও মানবসম্পদ বিভাগের বর্তমান চেয়ারম্যান ক্রিস্তারিনা গিওরগিভা (৬৩)।
আন্তোনিও গুতেরেস
যেভাবে বাছাইজাতিসংঘের মহাসচিব কে হবেন সে সিদ্ধান্ত সাধারণ পরিষদে হলেও প্রার্থী বাছাইয়ের কাজটি হয় নিরাপত্তা পরিষদে। বিভিন্ন দেশের প্রস্তাবিত প্রার্থীদের তালিকা নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে এই বাছাই প্রক্রিয়া চলে।
প্রার্থীদের সাক্ষাৎকারের পর জুলাই মাসের শেষ দিকে শুরু হয় অনানুষ্ঠানিক ভোট বা ‘স্ট্র পোল’। মূলত প্রার্থীর সংখ্যা কমিয়ে আনাই এর উদ্দেশ্য।
পাঁচটি স্থায়ী ও ১০টি অস্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তা পরিষদে সাধারণত স্থায়ী সব সদস্য রাষ্ট্রের ঐকমত্যের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে সাধারণ পরিষদে সুপারিশ করা হয়।
নিরাপত্তা পরিষদে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পছন্দক্রমের গোপন ভোটের ফল ফাঁস হয়ে পর্তুগালের গুতেরেসের এগিয়ে থাকার খবর আগেই প্রকাশ হয়েছিল ইন্টারনেটে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, বুধবার ষষ্ঠ স্ট্র পোলে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলো দশজন প্রার্থীর বিষয়ে ভোটাভুটিতে অংশ নেন। তিন ধরনের ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল তাদের সামনে- ‘উৎসাহ দিন’, ‘নিরুৎসাহিত করুন’ আর ‘মতামত নেই’।
আন্তোনিও গুতেরেসকে সমর্থন দিয়ে ভোট পড়েছে ১৩টি, বাকি দুজন কোনো মতামত দেননি। অর্থাৎ, তার মনোনয়ন কোনো বিরোধিতার মুখে পড়েনি।
মহাসচিব হলে গুতেরেসকে জাতিসংঘের প্রধান কূটনীতিক ও শীর্ষ ‘প্রশাসনিক কর্মকর্তা’র দায়িত্ব পালন করতে হবে।
বিবিসির কূটনৈতিক প্রতিবেদক জেমস ল্যান্ডেল বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী সদস্য দেশের হাতে জাতিসংঘের মূল ক্ষমতা থাকলেও মহাসচিবকে অনেক গুরুদায়িত্ব পালন করতে হয়।
এর মধ্যে আছে বিশ্বশক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক চাহিদার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, গোপনে ও প্রকাশ্যে আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে ভূমিকা রাখা এবং বিশাল একটি আমলাতন্ত্রকে পরিচালনা করা।
জাতিসংঘ মহাসচিব পদে একজন দুই মেয়াদে সর্বোচ্চ ১০ বছর দায়িত্ব পালন করতে পারেন।